আমি ব্যক্তিগতভাবে তার মৃত্যুতে সত্যিকার্থে শোকাহত।
তার মতো ভদ্র, শালীন, মার্জিত, ও উন্নত মানসিকতার রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ কখনো দেখেছে বলে মনে হয়না। রাজপথে সরাসরি তার অনেক বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু কোথাও তিনি একটা উগ্র বা হিংসাত্মক বাক্য উচ্চারণ করতে দেখিনি।
#শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী রহ. যেমন মেপে মেপে কথা বলতেন, ঠিক উনিও কাউকে হার্ট না করে বা রাগ-ক্ষোভ দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, অত্যান্ত মার্জিত ভাষায় যুক্তি নির্ভর কথা বলতেন। কখনো ঘৃণা চাষ করতে দেখিনি।
আমি মনে করি, তাকে হারিয়ে বাংলাদেশ তার রাজনীতির আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারালো।
কেউ বলতে পারবেনা তিনি অন্যান্য রাজনীতিবিদদের মতো তার অঞ্চলে সন্ত্রাস কায়েম করেছে। এমনকি আওয়ামীদের কোনো জুলমই তার ভদ্রতার পোশাক খোলাতে পারেনি।
আমি দেখেছি তিনি ইসলামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এবং জায়ায়াত শিবিরের নেতৃবৃন্দের সাথে তার সখ্যতা ছিলো বেশ। যার কারণে আমি কখনো দেখিনি তিনি জামায়াত বা ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে (অন্যদের মতো) কোনো ধরনের কটু কথা বলতে। জোটের ক্ষমতার আমলে জামায়াত শিবির তাদের নানান আয়োজনে তাকে আমন্ত্রণ জানাতো এবং তিনি সেখনে গিয়ে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করতেন, এবং শিবিরের মাঝেই তিনি আগামীর বাংলাদেশকে খুঁজে পেতেন।
'দোষে গুণে মানুষ', এর বাহিরে তিনিও ছিলেন না।
কিন্তু তাকে যেভাবে ভিলেন হিসেবে চিত্রিত করা হতো, আমি সবসময় এমন চিত্রায়ণের বিরুদ্ধে ছিলাম।
একটা ঘটনার কথা বলি যার জন্যে তাকে দোষারোপ করা হয়,
৪ মে ২০১৩ সালে মতিঝিলে জোটের মহাসমাবেশ ছিলো, এবং পরিকল্পনা ছিলো সেখানে অবস্থান করা যতক্ষণ না সরকারের পতন হয় কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে না নেয়।
কিন্তু সন্ধ্যার দিকে খালেদা জিয়া বক্তব্য ও আলটিমেটাম দিয়ে প্রোগ্রাম শেষ করে দেয়।
এতে আমরা খুব ক্ষুব্ধ ছিলাম, যেহেতু আমরা তথা জামায়াত শিবির সেদিন সংখ্যায় বেশি ছিলো এবং জামায়াতের কোনো নেতাকে তখনো ফাঁসী দেয়নি, তাই আমরা সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার চিন্তা মাথায় নিয়েই ময়দনে ছিলাম।
যেহেতু সরকারের পতন না হলে আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে, আমারা আমাদের দায়িত্বশীলদের হারাচ্ছি।
কিন্তু খালেদা জিয়া কোনো এক ইশারায় সেদিনের মত সমাবেশের ইতি টেনে দেয়, যা আমাদেরকে আহত করে।
অনেকে বলে থাকেন সেদিন অবস্থান করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পিছনে মূলত মওদুদ দায়ী, এবং তার পথধরেই আওয়ামী সরকারের টিকে থাকা।
কিন্তু আমার কথা হলো, তিনি যদি সত্যিই অবস্থান করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের মূল কারিগর হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি বুদ্ধিদীপ্ত বিজ্ঞ পলিটিসিয়ানের মতোই কাজটা করেছেন৷
কারণ, পরের দিন তথা #৫মে_শাপলা_চত্ত্বর এ অরাজনৈতিক ধর্মপ্রাণ হেফাজত কর্মীদের উপর যে #গণহত্যা পরিচালনা করা হয়, তার চাইতেও ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করতো আমাদের উপর, এটা সহজেই অনুমেয়, যেহেতু আমরা ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে পতন নিশ্চিত করতে যাচ্ছিলাম। এবং সেদিন আওয়ামীরা যে গণহত্যা চালাতো তাতে বেশি হতাহত হতো জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা, কারণ তাদের উপস্থিতি সেদিন সবথেকে বেশি ছিলো।
তবে তার মতো একজন প্রাজ্ঞ মানুষ যে 'জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার' আদর্শ লালন করেছেন তাকে জাহেলিয়াত ও ভুল মনে করি।
কিন্তু রাজনীতিতে তার ভদ্রতা ও বিনয়ী আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এবং আমি তার প্রতি সবসময়ই দূর্বল ছিলাম।
আমরা জানি তার উন্নত ব্যক্তিত্বে প্রভাবিত হয়ে কবি জসিমউদদীন তার প্রিয় কন্যা হাসানাকে তার হাতে তুলে দেন।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা তিনি যেনো তার ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেন।

